বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল দিয়ে পোশাক তৈরি না করে সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়ার মাধ্যমে প্রায় ১৩৭ কোটি টাকা শুল্ককর ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (সিইপিজেড) শতভাগ পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মোডিস্ট (বাংলাদেশ) লিমিটেডের বিরুদ্ধে। চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের নিরীক্ষায় এই বিপুল অঙ্কের শুল্ককর ফাঁকির তথ্য উঠে এসেছে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রমতে, পুরুষ ও নারীদের শার্ট, জ্যাকেট এবং শিশুদের পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মোডিস্ট (বাংলাদেশ) লিমিটেড ২০০৯ সালে বন্ড লাইসেন্স পায়। প্রতিষ্ঠানটি ইতালি, চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, জার্মানি, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, জাপান ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বন্ড সুবিধায় কাপড়, এক্সেসরিজ ও প্যাকিং ম্যাটেরিয়াল আমদানি করে থাকে এবং প্রস্তুত করা পোশাক জার্মানি, গ্রেট ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, ল্যাটিন আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে। প্রতিষ্ঠানটির ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিরীক্ষা সম্পন্ন থাকলেও এরপর থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কোনো নিরীক্ষা হয়নি। সম্প্রতি চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ের নিরীক্ষা পরিচালনা করলে প্রতিষ্ঠানের আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল অবৈধভাবে অপসারণের তথ্য উঠে আসে। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা পড়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মোডিস্ট ১৮ লাখ ৬৯ হাজার ৪২ কেজি বিভিন্ন ধরনের কাপড়, এক্সেসরিজ ও প্যাকিং ম্যাটেরিয়াল আমদানি করে। এর সঙ্গে ২০২২ সালের ২২ লাখ ৮৮ হাজার ৪৬ কেজি কাঁচামালের মজুদ যুক্ত হলে প্রতিষ্ঠানটিতে মোট ৪১ লাখ ৫৭ হাজার ৪২ কেজি কাঁচামাল থাকার কথা ছিল, যার মধ্যে পোশাক তৈরিতে ব্যবহৃত হয় ১২ লাখ ১৭ হাজার ৯৬২ কেজি। ২০২৩ সালেই প্রতিষ্ঠানটি আরও ২৭ লাখ ৬ হাজার ৬৩ কেজি কাঁচামাল আমদানি করে, ফলে আগের মজুদসহ ৫৬ লাখ ৪৫ হাজার ২৮৯ কেজি কাঁচামাল থাকার কথা ছিল। ওই বছর ১৫ লাখ ৫০ হাজার ৮২১ কেজি কাঁচামাল পোশাক তৈরিতে ব্যবহারের পর রপ্তানি শেষে ৪০ লাখ ৯৪ হাজার ৪৬৮ কেজি কাঁচামাল থাকার কথা ছিল প্রতিষ্ঠানটির কাছে। এরপর ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি আমদানি করে ৬ লাখ ৮২ হাজার ৩৬১ কেজি কাঁচামাল, যার মধ্যে ৫ লাখ ১২ হাজার ৮৪ কেজি পোশাক তৈরি ও রপ্তানিতে ব্যবহৃত হয়।
হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল—এই তিন বছরে মোডিস্ট মোট ১ কোটি ৪৫ লাখ ৭৯ হাজার ২০৮ কেজি বা ১৪ হাজার ৫৭৯ মেট্রিক টন কাপড়, এক্সেসরিজ ও প্যাকিং ম্যাটেরিয়াল বন্ড সুবিধায় আমদানি করেছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই কাপড়। এর মধ্যে ৩৮ লাখ ৫৮ হাজার ৫৮২ কেজি বা ৩ হাজার ৮৫৮ মেট্রিক টন কাঁচামালের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি নিরীক্ষায়। এই কাঁচামালের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় ১৫৬ কোটি টাকা, যাতে প্রযোজ্য শুল্ককরের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৩৭ কোটি ৬২ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। এই কাঁচামাল অবৈধভাবে খালাস করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে এবং প্রযোজ্য শুল্ককর আদায়ে মোডিস্ট (বাংলাদেশ) লিমিটেডকে দাবিনামা জারির সুপারিশ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এর আগেও অনিয়মের অভিযোগ ছিল। ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময়ে ৩৪টি রপ্তানি রিয়েলাইজেশন সার্টিফিকেটের (পিআরসি) বিপরীতে ২৯ কোটি ২৯ লাখ ৮৫ হাজার ৩২৪ টাকা দেশে প্রত্যাবাসিত হয়নি বলে জানা যায়, যা নিয়ে বিচারাদেশ জারি হলে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে রিট করা হয়, যা এখনো চলমান।
একই ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে জেএমএস গ্রুপের মালিকানাধীন জেএমএস গার্মেন্টস লিমিটেডের বিরুদ্ধেও। প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধার ১৩ হাজার ৭৯৭ মেট্রিক টন কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেট। এই কাঁচামালের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় ৬৩৩ কোটি টাকা, যাতে প্রযোজ্য শুল্ককরের পরিমাণ প্রায় ৫৮৫ কোটি টাকা। সিইপিজেডের মতো সুরক্ষিত এলাকা থেকে এভাবে বন্ড সুবিধার কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রির ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোডিস্ট (বাংলাদেশ) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তাফা মাহমুদকে ফোন দেওয়া হলে তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বক্তব্য জানতে চেয়ে বার্তা পাঠানো হলে তিনি তা দেখলেও কোনো জবাব দেননি। প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র ম্যানেজার (কমার্শিয়াল) মোহাম্মদ মুরাদ হোসেনকেও ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি এবং হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা দেখলেও কোনো উত্তর দেননি।