শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অপরাধ-দুর্নীতি

ব্যাটারি ব্যবসার আড়ালে ৩১৭ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক | ৩০ আগস্ট ২০২৬

ব্যাটারি উৎপাদন ও বিক্রয়ের হিসাব ঘিরে ৩১৭ কোটি ৯২ লাখ ৫১ হাজার ৩৭৮ টাকার মূসক (ভ্যাট) ফাঁকির তথ্য উদঘাটন করেছে নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে জিউঝৌ ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের বাণিজ্যিক নথিপত্র জব্দের পর সেগুলো বিশদভাবে যাচাই ও হিসাব-নিকাশ করে এই বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে।

গত ৩ আগস্ট জিউঝৌ ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের প্রাঙ্গণে নিবারক অভিযান চালায় অধিদপ্তরের একটি দল। এ সময় প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বাণিজ্যিক দলিলাদি ও হিসাবসংক্রান্ত নথি জব্দ করা হয়। পরে জব্দ করা নথিপত্রের বিস্তারিত পর্যালোচনা ও হিসাব-নিকাশ শেষে ব্যাটারি উৎপাদন ও বিক্রয়ের বিপরীতে ৩১৭ কোটি ৯২ লাখ ৫১ হাজার ৩৭৮ টাকার ভ্যাট ফাঁকির তথ্য উদঘাটিত হয়।

অধিদপ্তরের দাবি, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রকৃত তথ্য গোপন রেখে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। তবে ঠিক কোন পদ্ধতিতে, কোন সময়ের লেনদেনে এবং কোন কোন হিসাবের মাধ্যমে এত বিপুল পরিমাণ ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া হয়েছে—সেই বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করেনি সংস্থাটি।

নথি জব্দ, এরপর হিসাবের অসঙ্গতি

তদন্তের শুরু হয় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানের মাধ্যমে। অভিযানে প্রতিষ্ঠানটির বাণিজ্যিক নথিপত্র জব্দ করা হয়। এরপর সেগুলো পর্যালোচনা করে উৎপাদন ও বিক্রয় কার্যক্রমের বিপরীতে প্রাপ্য ভ্যাটের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের হিসাবের তুলনা করা হয়।

এই যাচাই-বাছাইয়ের পরই ৩১৭ কোটি ৯২ লাখ ৫১ হাজার ৩৭৮ টাকা ভ্যাট ফাঁকির অঙ্ক সামনে আসে। অর্থাৎ, সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এটি কেবল অভিযানের সময়ের তাৎক্ষণিক হিসাব নয়; জব্দ করা নথি ও হিসাব বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নির্ধারিত রাজস্ব ফাঁকির অঙ্ক।

কীভাবে ফাঁকি হলো?

তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভ্যাট ফাঁকির পদ্ধতি। ব্যাটারি উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে উৎপাদনের পরিমাণ, কাঁচামাল ব্যবহার, আমদানি, মজুত, বিক্রয়, বিক্রয়মূল্য, ভ্যাট চালান এবং দাখিল করা ভ্যাট রিটার্ন—এসব তথ্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার মাধ্যমেই প্রকৃত লেনদেন ও ঘোষিত লেনদেনের পার্থক্য বের করার সুযোগ থাকে।

তাই জিউঝৌ ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রে কোন হিসাবের সঙ্গে কোন হিসাবের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে, কত বছরের লেনদেন যাচাই করা হয়েছে এবং কোন নথির ভিত্তিতে ৩১৭ কোটি ৯২ লাখ ৫১ হাজার ৩৭৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে—এসব তথ্যই তদন্তের মূল প্রশ্ন।

বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় রেজিস্টার, ভ্যাট রিটার্ন, মূসক চালান, ব্যাংক লেনদেন, উৎপাদন রেকর্ড ও কাঁচামাল আমদানির তথ্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল কি না, তা সামনে এলে ফাঁকির প্রকৃত কৌশল আরও স্পষ্ট হবে।

আগেও নিয়ম ভাঙার অভিযোগ

জিউঝৌ ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের বিরুদ্ধে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগটি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন প্রতিষ্ঠানটির অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংক্রান্ত অনিয়মের তথ্যও প্রকাশ্যে এসেছে। সরকারি কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্যভান্ডারে প্রতিষ্ঠানটিকে রূপগঞ্জের তারাব এলাকায় একটি ব্যাটারি কারখানা হিসেবে নিবন্ধিত দেখানো হয়েছে।

এর আগে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) জিউঝৌ ইন্ডাস্ট্রিকে প্রয়োজনীয় বিএসটিআই সার্টিফিকেশন ও প্যাকেজিং নিবন্ধন ছাড়া ব্যাটারি উৎপাদন, বিক্রি ও বিতরণের অভিযোগে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল বলে দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে বাণিজ্যিক তথ্যভান্ডারগুলোতে প্রতিষ্ঠানটির চীন থেকে কাঁচামাল ও অন্যান্য পণ্য আমদানির রেকর্ডও পাওয়া যায়। একটি বাণিজ্য তথ্যভান্ডারের হিসাবে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির ১৯০টি আমদানি চালানের তথ্য রয়েছে।

৩১৭ কোটি ৯২ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি

৩১৭ কোটি ৯২ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি উদঘাটনের তথ্য প্রকাশের পর এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই অর্থের সঙ্গে কোনো অতিরিক্ত শুল্ক, সুদ, জরিমানা বা অন্যান্য রাজস্ব দায় যুক্ত হবে কি না। একই সঙ্গে কোন সময়ের জন্য এই ফাঁকি নির্ধারণ করা হয়েছে এবং চূড়ান্তভাবে সরকারের কোষাগারে কত টাকা আদায় হবে, সেটিও নির্ধারণের অপেক্ষায়।

এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি যদি প্রকৃত উৎপাদন ও বিক্রয়ের তথ্য গোপন করে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট হিসাব, ভ্যাট রিটার্ন ও আর্থিক নথিতে সেই গোপনীয়তার পরিমাণ কত—সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন

নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর জানিয়েছে, উদঘাটিত রাজস্ব আদায় এবং ভ্যাট আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি ও বিচারিক কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

অধিদপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধে এ ধরনের গোয়েন্দা নজরদারি ও নিবারক অভিযান অব্যাহত থাকবে।

তবে ৩১৭ কোটি ৯২ লাখ ৫১ হাজার ৩৭৮ টাকার ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগের চূড়ান্ত দায় নির্ধারিত হবে সংশ্লিষ্ট আইনগত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে। এখন মূল নজর—কোন হিসাবের কারসাজিতে, কত সময় ধরে এবং কার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতায় সরকারের এত বিপুল রাজস্ব ফাঁকি হয়েছে, সেই প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর বেরিয়ে আসে কি না।

সর্বশেষ সংবাদ
কৃষকদের ৫ বছরের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ চালিত পানির পাম্প দেওয়া হবে : প্রধানমন্ত্রী

কৃষকদের ৫ বছরের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ চালিত পানির পাম্প দেওয়া হবে : প্রধানমন্ত্রী

বিএসসি থেকে মন্ত্রীর একান্ত সচিব হলেন সোহেল পারভেজ

বিএসসি থেকে মন্ত্রীর একান্ত সচিব হলেন সোহেল পারভেজ

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সচিব হলেন নূর-এ-জান্নাত রুমি

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সচিব হলেন নূর-এ-জান্নাত রুমি

চট্টগ্রামে জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার হলেন অভিষেক দাশ

চট্টগ্রামে জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার হলেন অভিষেক দাশ

চার মাস অতিরিক্ত দায়িত্বের পর পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান

চার মাস অতিরিক্ত দায়িত্বের পর পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান

বারবার রদবদলের পর বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম

বারবার রদবদলের পর বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম

সরকারি হাসপাতালে অনুমোদিত ৪১,৮০৬ পদের বিপরীতে পদস্থ ৩০,৩১১ জন : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

সরকারি হাসপাতালে অনুমোদিত ৪১,৮০৬ পদের বিপরীতে পদস্থ ৩০,৩১১ জন : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

সৃজনশীল প্রতিভাবানদেরও ঋণ দিতে বললেন অর্থমন্ত্রী

সৃজনশীল প্রতিভাবানদেরও ঋণ দিতে বললেন অর্থমন্ত্রী

বাংলাদেশ-ইতালি সম্পর্ক আরো জোরদারে সহযোগিতা বাড়াতে চান এলজিআরডি মন্ত্রী

বাংলাদেশ-ইতালি সম্পর্ক আরো জোরদারে সহযোগিতা বাড়াতে চান এলজিআরডি মন্ত্রী

রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনে সব ধরনের সহযোগিতা দেবে বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী

রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনে সব ধরনের সহযোগিতা দেবে বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী