পুরোনো টেক্সটাইল মেশিনারির আড়ালে উচ্চ শুল্কের স্ক্রু, অটোমোবাইল ও থ্রি-হুইলারের যন্ত্রাংশ এনে চট্টগ্রাম বন্দরে শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা ধরা পড়েছে। নরসিংদীর দুই আমদানিকারকের ১০ কনটেইনারে একই কৌশলে এসব পণ্য আনা হয়। ১০ আগস্ট চট্টগ্রাম কাস্টমসের গোয়েন্দা দলের তৎপরতায় চালান দুটি আটকে দিয়ে শতভাগ কায়িক পরীক্ষায় ঘোষণাবহির্ভূত বিপুল পরিমাণ পণ্য পাওয়া যায়।
কাস্টমসের নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, চীন থেকে আসা চালান দুটিতে কনটেইনারের সামনে রাখা হয়েছিল পুরোনো ও জীর্ণ টেক্সটাইল মেশিন। পেছনে রাখা হয় বস্তাভর্তি স্ক্রু, নাট-বল্টু, অটোমোবাইল ও থ্রি-হুইলারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। কাস্টমসের চোখ এড়াতেই পণ্য সাজানোর এমন কৌশল নেওয়া হয়েছিল বলে ধারণা করছে গোয়েন্দা দল।
দুই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান হলো নরসিংদীর মাধবদীর মেসার্স রিমি সরকার দোয়া টেক্সটাইল ও এস এন টেক্সটাইল। তাদের চালান দুটির খালাসের দায়িত্বে ছিল চট্টগ্রামের এনাতুল হাসান সিঅ্যান্ডএফ লিমিটেড।
কাস্টমসের তথ্যমতে, টেক্সটাইল খাতের যন্ত্রপাতির শুল্ক-কর যেখানে ২৬ শতাংশ, সেখানে উড স্ক্রু ও নাট-বল্টুর ওপর মোট শুল্ক-কর প্রায় ৬০ শতাংশ। অন্যদিকে থ্রি-হুইলার ও অটোমোবাইলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে শুল্ক-কর ৫৫ থেকে প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত। এই বড় ব্যবধানকে কাজে লাগিয়েই কম শুল্কের পণ্যের ঘোষণা দিয়ে বেশি শুল্কের পণ্য আনা হয়েছে বলে কাস্টমস কর্মকর্তাদের ধারণা।
কাস্টমসের নথি অনুযায়ী, মেসার্স রিমি সরকার দোয়া টেক্সটাইল ১ লাখ ৩২ হাজার ৫০০ কেজি সেকেন্ডহ্যান্ড পাওয়ার লুম আমদানির ঘোষণা দেয়। চালানটির ঘোষিত মূল্য ছিল ৯১ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার, যা প্রতি ডলার ১২৫ টাকা হিসাবে প্রায় ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা। তবে কায়িক পরীক্ষায় ১ লাখ ৭ হাজার কেজি লুম মেশিনের পাশাপাশি ঘোষণাবহির্ভূত ৩৫ হাজার ৩১০ কেজি উড স্ক্রু পাওয়া যায়।
অন্য চালানে এস এন টেক্সটাইল একই ধরনের ১ লাখ ৩২ হাজার কেজির বেশি সেকেন্ডহ্যান্ড লুম মেশিন আমদানির ঘোষণা দেয়। এর ঘোষিত মূল্য ছিল ৭৯ হাজার ৬০০ ডলার বা প্রায় ১ কোটি টাকা।
তবে কায়িক পরীক্ষায় লুম মেশিনের আড়ালে পাওয়া যায় ২১ হাজার ৫৫০ কেজি ফ্ল্যাঞ্জ নাট-বল্টু, ৬ হাজার ৪৯৬ কেজি শক কানেক্টর, ৩ হাজার ৩৬০ কেজি শক অ্যাবজরবার পাইপ, ২ হাজার ৬৫০ কেজি গিয়ার, ২ হাজার ৫৬০ কেজি রিম, ২ হাজার ১০৬ কেজি ডিফারেনশিয়াল এবং ৪৮০ কেজি মাডগার্ডসহ বিভিন্ন অটোমোবাইল ও থ্রি-হুইলার যন্ত্রাংশ। এসব পণ্যই ছিল ঘোষণার বাইরে।
কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে অনলাইনে চালান দুটির খালাস স্থগিত করা হয়। পরে বন্দর, কাস্টমস ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে কনটেইনার খুলে শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করা হয়। বর্তমানে চালানগুলো সিলগালা করে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনালের ইয়ার্ডে রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস গোয়েন্দা দলের প্রধান তারেক মাহমুদ বলেন, সামনে পুরোনো টেক্সটাইল মেশিন রেখে পেছনে বেশি শুল্কের পণ্য এনে ফাঁকি দেওয়ার কৌশল কাস্টমসের নজর এড়াতে পারেনি। কায়িক পরীক্ষা শেষে এখন জরিমানার প্রক্রিয়া চলছে। আইন অনুযায়ী শুল্ক-কর ফাঁকির সমপরিমাণ থেকে দ্বিগুণ পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
এদিকে চালান খালাসের দায়িত্বে থাকা এনাতুল হাসান সিঅ্যান্ডএফ লিমিটেডের মালিক কামরুল হক দাবি করেন, কনটেইনারের ভেতরে কী পণ্য রয়েছে, তা তিনি জানেন না; আমদানিকারকই তা জানেন। দুটি চালানেই একই কৌশলে পণ্য থাকার বিষয়টি জানানো হলে তিনি মেশিনারির সঙ্গে কিছু স্ক্রু আনা যায় বলে দাবি করেন। পরে মেশিনারির স্ক্র্যাপ ও স্ক্রুর আকারের পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
কাস্টমস কর্মকর্তাদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে, চালান দুটির ঘোষিত মূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা হলেও শুল্ক-কর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে মাত্র প্রায় ৮ লাখ টাকা। আমদানিকারকের ঘোষিত মূল্য নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। কাস্টমস কর্মকর্তাদের ধারণা, ঘোষণার আড়ালে উচ্চ শুল্কের পণ্য আমদানির পাশাপাশি অর্থপাচারের চেষ্টাও থাকতে পারে।
কর্মকর্তারা বলছেন, মেশিনারির নামে আনা পুরোনো পণ্যগুলোর অনেকগুলোই কারখানায় ব্যবহারের উপযোগী নয়; বরং স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রির উদ্দেশ্যে আনা হয়ে থাকতে পারে। বেশি শুল্কের স্ক্রু, অটোমোবাইল ও থ্রি-হুইলার যন্ত্রাংশ সহজে খালাস করতেই কনটেইনারের সামনে কম শুল্কের পুরোনো মেশিন রাখা হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
কাস্টমসের সূত্র বলছে, ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আমদানি ও শুল্ক ফাঁকির এ ঘটনা কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর সংশ্লিষ্ট বিধান লঙ্ঘনের শামিল। আটক পণ্যের প্রকৃত বাণিজ্যিক মূল্যের ভিত্তিতে শুল্কায়ন, মামলা এবং বিধি অনুযায়ী জরিমানা আরোপের প্রক্রিয়া চলছে।