সিগারেটের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) নির্ধারণে প্রস্তুতকারকদের ‘স্বাধীনতা’ চেয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে একাধিকবার আবেদন করেছে বহুজাতিক সিগারেট কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটি)। বিশেষ করে নিজেদের ডারবি, পাইলট, হলিউড ও লাকি স্ট্রাইক ব্র্যান্ডের দাম কমানোর সুযোগ চায় কোম্পানিটি। বিএটির দাবি, সিগারেটের দাম বাড়ায় বৈধ বাজারে বিক্রি কমেছে এবং অবৈধ সিগারেটের বাজার বেড়েছে। দাম কমানোর সুযোগ দেওয়া হলে বিক্রি ও সরকারের রাজস্ব—দুটিই বাড়বে। তবে বিএটির দেওয়া বিক্রির তথ্য বিশ্লেষণে তাদের দাবির সঙ্গে বাস্তব চিত্রের বড় ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া যাচ্ছে। বরং কোম্পানিটির প্রস্তাব অনুমোদন করা হলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি।
বিএটির প্রস্তাব অনুযায়ী, ডারবি, পাইলট ও হলিউড ব্র্যান্ডের প্রতি প্যাকেট ১০ শলাকার সিগারেটের দাম ৭২ টাকা থেকে কমিয়ে ৬৩ টাকা এবং লাকি স্ট্রাইকের দাম ১০৮ টাকা থেকে ৯২ টাকা করার সুযোগ দিতে হবে। এ জন্য এনবিআর অনুমোদিত মূল্যস্তরের মধ্যে প্রস্তুতকারকদের নিজেদের ব্র্যান্ডের এমআরপি নির্ধারণের স্বাধীনতা চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি) বলছে, বিএটির এই প্রস্তাব অনুমোদন করা হলে সরকার ২ হাজার ২১১ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারাতে পারে। একই সঙ্গে তামাক কোম্পানিকে এভাবে মূল্য নির্ধারণের স্বাধীনতা দেওয়া হলে তা ভবিষ্যতে করনীতিতে নজিরবিহীন প্রভাব ফেলতে পারে।
পাঁচ বছরের তথ্যেই বিএটির দাবিতে প্রশ্ন
বিএটি এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে চলতি বছরের জুলাইয়ে সিগারেট বিক্রি কমে যাওয়ার তথ্য তুলে ধরে দাম বৃদ্ধির প্রভাবের কথা বলছে। কোম্পানির দেওয়া হিসাবে, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রায় ৪০৩ বিলিয়ন শলাকা সিগারেট বিক্রির বিপরীতে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বিক্রি হয়েছে প্রায় ২১৮ বিলিয়ন শলাকা। এ হিসাবে এক বছরে বিক্রি কমেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ।
কিন্তু সংশ্লিষ্ট তথ্যের পেছনের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে চিত্রটি ভিন্ন। ২০২৫ সালে মহাখালী থেকে সাভারে কারখানা স্থানান্তরের কারণে উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ওই সময় কারখানা স্থানান্তরজনিত কারণে বাজারে অতিরিক্ত সিগারেট সরবরাহ করা হয়েছিল। ফলে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের বিক্রিকে স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জুলাই মাসে বিএটির গড় বিক্রি ছিল প্রায় ২১৮ বিলিয়ন শলাকা। অর্থাৎ ২০২৬ সালের জুলাইয়ে কোম্পানিটির প্রায় ২১৮ বিলিয়ন শলাকা বিক্রি পাঁচ বছরের স্বাভাবিক বিক্রির গড়ের সঙ্গে প্রায় সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এতে প্রশ্ন উঠছে, ২০২৫ সালের অস্বাভাবিকভাবে বেশি বিক্রিকে ভিত্তি ধরে ২০২৬ সালের বিক্রি ৪৫ শতাংশ কমেছে বলে যে চিত্র এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে, সেটি কতটা বাস্তবসম্মত।
বিক্রি কমলেও রাজস্ব কেন বাড়ল?
বিএটির দাবির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—বিক্রি কমে যাওয়ার কারণে সরকারের রাজস্বও কমেছে। কিন্তু জুলাই মাসের রাজস্বের হিসাবেও ভিন্ন চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাইয়ে বিএটির কাছ থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ১৩২ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৯৩৬ কোটি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ২৪১ কোটি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৪৫ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাইয়ে রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা।
অর্থাৎ ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের গড় রাজস্ব আদায় যেখানে প্রায় ১ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে আদায় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা। গড়ের তুলনায় রাজস্ব আদায় বেড়েছে প্রায় ৩৩৫ কোটি টাকা।
ফলে একদিকে বিএটি বিক্রি কমে যাওয়ার কারণে রাজস্ব কমেছে বলে যুক্তি দিচ্ছে, অন্যদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর জুলাই মাসের গড়ের তুলনায় রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই দুই তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রথমে এলটিইউ, পরে এনবিআর—এবার অর্থমন্ত্রী
বিএটির দাম কমানোর উদ্যোগের পেছনে ধারাবাহিক তৎপরতার তথ্যও পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) কাছে বর্তমান ঘোষিত মূল্যের চেয়ে কম দামে সিগারেট বিক্রির সুযোগ চায়।
বিশেষ করে নিম্নস্তরের সিগারেটের ক্ষেত্রে ‘তদুর্ধ্ব’ শব্দের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে নিজেদের মূল্য নির্ধারণের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানায় তারা। তবে এলটিইউ জানায়, প্রচলিত আইন ও এনবিআরের আদেশ অনুযায়ী কোনো সিগারেটের দাম একবার ঘোষণা করার পর পরবর্তী সময়ে তার চেয়ে কম দামে বিক্রির সুযোগ নেই।
এরপর বিএটির পক্ষ থেকে এনবিআরের সদস্য ও চেয়ারম্যান পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সেখানেও বাজেটের বাইরে সিগারেটের মূল্য কমানোর বিষয়ে আইনগত সীমাবদ্ধতার কথা জানানো হয়। এখন প্রতিষ্ঠানটি অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে বিশেষ সিদ্ধান্ত পাওয়ার চেষ্টা করছে বলে সূত্রগুলোর দাবি।
বাজেটের আগের প্রস্তাবেও ছিল মূল্য নির্ধারণের স্বাধীনতা
বিএটি শুধু বাজেট-পরবর্তী সময়ে দাম কমানোর আবেদন করেনি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আগে গত ৮ মে এনবিআরের কাছে দেওয়া প্রস্তাবেও সিগারেটের জন্য ‘স্পেসিফিক এক্সাইজ কাঠামো’ চালু এবং প্রস্তুতকারকদের মূল্য নির্ধারণের স্বাধীনতার কথা বলেছিল।
কোম্পানিটির যুক্তি ছিল, মোট সিগারেট বিক্রির প্রায় ৮৪ শতাংশ তৃতীয় ও চতুর্থ স্তর থেকে আসে। তাই এসব স্তরের ফ্লোর প্রাইস যৌক্তিকভাবে সমন্বয় করা হলে রাজস্ব বাড়তে পারে। একই সঙ্গে স্পেসিফিক কর কাঠামো চালু হলে প্রস্তুতকারকেরা নিজেদের ব্র্যান্ডের মূল্য নির্ধারণে বেশি স্বাধীনতা পাবে এবং বাজারে হারানো বিক্রি পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে বলে দাবি করে বিএটি।
৭ জুনের আদেশেই দাম কমানোর পথ বন্ধ
তবে বিএটির বর্তমান দাবির সঙ্গে চলতি অর্থবছরের কর কাঠামোর সরাসরি সংঘাত রয়েছে। গত ৭ জুন জারি করা এসআরও নং ১২৯-আইন/২০২৬/৩৩৪-এর ৩ নম্বর ধারায় বাজারে ইতোমধ্যে প্রচলিত কোনো সিগারেট ব্র্যান্ডের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য কমানোর সুযোগ রাখা হয়নি বলে বিএনটিটিপি জানিয়েছে।
এ অবস্থায় একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির ব্যবসায়িক স্বার্থ বিবেচনায় বিদ্যমান নীতি পরিবর্তন করা হলে ভবিষ্যতে অন্যান্য কোম্পানিও একই ধরনের সুবিধা দাবি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংগঠনটি।
২,২০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা
বিএটির প্রস্তাব অনুযায়ী ডারবি, পাইলট ও হলিউডের প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটের দাম ৯ টাকা এবং লাকি স্ট্রাইকের দাম ১৬ টাকা কমানো হলে সরকারের রাজস্বে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে বলে হিসাব দিয়েছে বিএনটিটিপি।
সংগঠনটির হিসাবে, নিম্নস্তরের সিগারেটে প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটে সরকারের রাজস্ব কমবে প্রায় ৭ টাকা ৪৭ পয়সা। মধ্যম স্তরের ক্ষেত্রে প্রতি প্যাকেটে রাজস্ব কমবে প্রায় ১৩ টাকা ২৮ পয়সা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর ব্র্যান্ডভিত্তিক বিক্রির তথ্য ধরে বিএনটিটিপির হিসাবে, ডারবি, পাইলট ও হলিউডের সম্ভাব্য বিক্রি প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি শলাকা এবং লাকি স্ট্রাইকের প্রায় ১৮০ কোটি শলাকা। এ হিসাবে বিএটির প্রস্তাব কার্যকর হলে নিম্নস্তরে প্রায় ১ হাজার ৯৭২ কোটি এবং মধ্যম স্তরে প্রায় ২৩৯ কোটি—মোট ২ হাজার ২১১ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারাতে পারে সরকার।
অবৈধ বাজারের তথ্য নিয়েও প্রশ্ন
বিএটির অন্যতম যুক্তি হলো, সিগারেটের দাম বাড়ার কারণে অবৈধ বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। কোম্পানিটির বক্তব্য, বর্তমানে অবৈধ সিগারেটের বাজারের অংশ প্রায় ১৮ শতাংশ এবং মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে তা প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এতে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলেও তারা দাবি করছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের পূর্বাভাসের ভিত্তি ও পদ্ধতি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে পাঁচ বছরের বিক্রির তথ্যের সঙ্গে ২০২৫ সালের অস্বাভাবিক সরবরাহের বিষয়টি বাদ দিয়ে বিক্রি কমার হিসাব তুলে ধরা হলে তা নীতিনির্ধারকদের কাছে বাজারের প্রকৃত চিত্রকে বিভ্রান্ত করতে পারে।
‘দাম কমিয়ে বাজার দখলের কৌশল’
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিএটি একদিকে সিগারেটের মূল্যস্তর বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি দিয়েছে, অন্যদিকে এখন নিজেদের ব্র্যান্ডের দাম কমানোর সুযোগ চাচ্ছে। ফলে পুরো বিষয়টিকে কেবল রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর পেছনে কোম্পানিটির নিজস্ব বাজার কৌশলও থাকতে পারে।
বিশেষ করে নিম্নস্তরের বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, ব্র্যান্ডের বিক্রি পুনরুদ্ধার এবং বাজারের অংশীদারিত্ব ধরে রাখাই দাম কমানোর অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, একটি বহুজাতিক তামাক কোম্পানিকে বাজারে নিজেদের মূল্য নির্ধারণের স্বাধীনতা দিলে সরকার কার্যত কর কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে তুলে দেবে। এতে কোম্পানিটি বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী দাম কমানো-বাড়ানোর মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নিতে পারবে।
বিএটির বক্তব্য পাওয়া যায়নি
বিএটির প্রস্তাব ও বিক্রির তথ্যের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক (এক্সটার্নাল কমিউনিকেশনস) বায়েজিদ জোয়ার্দারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তাঁর ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বক্তব্যের বিষয় জানিয়ে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি তা দেখেছেন, কিন্তু কোনো জবাব দেননি।
সব মিলিয়ে সিগারেটের দাম নির্ধারণে বিএটির ‘স্বাধীনতা’র দাবি এখন কেবল একটি কোম্পানির মূল্য কমানোর আবেদন নয়; এটি সরকারের তামাক করনীতি, রাজস্ব আদায় এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। বিশেষ করে বিএটির বিক্রি ও রাজস্ব কমার দাবির বিপরীতে পাঁচ বছরের তথ্য এবং ২০২৬ সালের জুলাইয়ের রাজস্ব আদায়ের চিত্রে যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে, তা যাচাই না করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ও করনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।