চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। ৪৯ দশমিক ১৫ একর জায়গাজুড়ে নির্মিতব্য এই টার্মিনালে থাকবে ৬১৬ মিটার দীর্ঘ জেটি এবং বছরে ৮ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা। দেশের অন্যতম বৃহৎ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) বিনিয়োগের এই প্রকল্প চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে।
রবিবার (৩০ আগস্ট) বেলা ১১টায় লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল এলাকায় গ্রাউন্ড ব্রেকিং অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্পটির নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এমপি।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা গেছে, টার্মিনালের মূল অংশ নির্মিত হবে ৩২ একর জায়গায়। এর সঙ্গে ৭ দশমিক ১৫ একর কনটেইনার ইয়ার্ড এবং ১০ একর ট্রাক পার্কিং ও প্রি-গেট সুবিধা যুক্ত হবে। সব মিলিয়ে ৪৯ দশমিক ১৫ একর জমিতে গড়ে উঠবে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল।
টার্মিনালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হবে ৬১৬ মিটার দীর্ঘ জেটি। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ৮ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক কনটেইনার ব্যবস্থাপনা সক্ষমতায় বড় ধরনের সংযোজন হবে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়লে অতিরিক্ত কনটেইনার চাপ সামলাতে টার্মিনালটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পটির নির্মাণ শেষ করতে সময় নির্ধারণ করা হয়েছে তিন বছর। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সাল থেকে ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস টার্মিনালটি পরিচালনা করবে। চুক্তির শর্ত পূরণ ও যথাযথভাবে পালন করা হলে পরিচালনার মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ সব শর্ত পূরণ হলে সর্বোচ্চ ৪৫ বছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্বে থাকতে পারে।
অবকাঠামোগত দিক থেকেও লালদিয়া টার্মিনালের অবস্থান কৌশলগত। কর্ণফুলী নদীর মোহনার কাছে লালদিয়া চরে এটি নির্মিত হচ্ছে। এর পর গুপ্তবাঁক পার হয়ে রয়েছে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি), যা পরিচালনা করছে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল। আরও প্রায় ৭ থেকে ৯ কিলোমিটার উজানে রয়েছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি)।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, একই বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনালের সঙ্গে লালদিয়া টার্মিনালের সংযোগ চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে। বিশেষ করে আধুনিক টার্মিনাল অবকাঠামো ও স্বয়ংক্রিয় প্রি-গেট সুবিধা চালু হলে পণ্য ও যানবাহন ব্যবস্থাপনায় গতি বাড়ার সুযোগ রয়েছে।
লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণে মোট বিনিয়োগ হবে ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। পিপিপি কাঠামোর আওতায় এপিএম টার্মিনালস প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। ২০২১ সালের জুনে বাংলাদেশ ও ডেনমার্ক সরকারের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হয়। এরপর ২০২৩ সালের ২১ মে এপিএম টার্মিনালস লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দেয়।
২০২৩ সালের ২৯ নভেম্বর অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি পিপিপি পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের নীতিগত অনুমোদন দেয়। পরে ২০২৪ সালের ৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ-ডেনমার্ক পিপিপি জয়েন্ট প্ল্যাটফর্মের সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হয়। পরবর্তী সময়ে ডেনমার্ক সরকারের পক্ষে এপিএম টার্মিনালস প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য গ্রহণ করে।
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের স্থানীয় সংসদ সদস্য এরশাদ উল্ল্যাহ ও শাহজাহান চৌধুরী, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং এপিএম টার্মিনালসসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।